সালাম, আমাদের অহংকার




ফেনী শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে দাগনভুঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের লক্ষণপুর গ্রামের পৈত্রিক বাড়ীতে ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর জাতির গর্বিত সন্তান ভাষা শহীদ আবদুস সালামের জন্ম। ৪ ভাই ৩ বোনের মধ্যে সালাম ছিল সবার বড়। '৫২-এর ভাষা আন্দোলনে শহীদ হবার আগেই ২০ বছর বয়সের ছোট বোন তরিকুন্নেছা মারা যান। ১৯৭৬-এর অক্টোবরে সালামের হতদরিদ্র বাবা ফাজিল মিয়া (৮৫)'র মৃত্যুর পর, '৮২ সালে মা দৌলতের নেছা (৮৫), ও ছোট ভাই সাহাবদ্দিন (৫৫), '৯৯ সালে ছোট বোন কুরফুলের নেছা (৭৫), ২০০২ সালে ভাই আবদুস ছোবহান ও ২০০৭ সালের ৩ জানুয়ারী বোন বলকিয়তের নেছা মারা যান। শহীদ সালাম মাতুভূঞা করিম উল্যাহ স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাশ করে দাগনভুঞার কামাল আতাতুর্ক হাই স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন। নবম শ্রেণীতে পড়া-লেখা চলাকালীন সময় জেঠাতো ভাই হাবিবের সহযোগীতায় সালাম পরিবারের স্বচ্চলতার স্বপ্নে ঢাকার ৫৮, দিলকুশা, মতিঝিল ডাইরেক্টর অব ইন্ডাষ্ট্রিজ কমার্স এ পিয়নের চাকুরীতে যোগদান করেন। '৫২ এর ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে সালাম কয়েক দিনের ছুটি কাটিয়ে বাড়ি থেকে ঢাকায় চাকুরী স্থলে ফিরে যান। রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে তখন ফেব্রুয়ারী মাস ঢাকা ছিল উত্তাল। আন্দোলন চলছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, রাজপথ সবখানে। সে আন্দোলনে চঞ্চল ২৭ বছরের টকবগে তরুন সালামের হৃদয়েও আন্দোলনের ডাক ছুয়ে যায়। একুশে ফেব্রুয়ারী ছিল রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে সারা দেশে আন্দোলনের প্রস্তুতি দিবস। ছাত্র জনতার এ আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য সরকার ঐ দিন ১৪৪ ধারা জারি করে সভা, সমিতি, মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু বাংলার দামাল ছেলেরা এ দমনমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়। তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সভা, সমাবেশ করল এবং মিছিল নিয়ে এগিয়ে গেল। মিছিলটি বর্তমানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাছে এলে কতৃপক্ষের নির্দেশে পুলিশ মিছিলের উপর গুলি চালায়। সেই মিছিলে সালামও যোগ দেন। রফিক, জাব্বার, বরকত, শফিক সহ নাম না জানা আরও অনেকের সাথে সালামও গুলিবিদ্ধ হন। বুলেট বিদ্ধ সালামকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে দিনই সন্ধ্যায় টেলিগ্রামে সালামের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে সালামের বাবা ফাজিল মিয়া, জেঠাতো ভাই হাবিব উল্যাহ ও প্রতিবেশী মকবুর আহমদ ২২ ফেব্রুয়ারী সকালে ঢাকায় ছুটে যান। গুলিবিদ্ধ সালামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারী শহীদ সালাম মৃতু্যর কোলে ঢলে পড়েন বলে জানান জানাযায় অংশগ্রহনকারী মকবুল আহমদ। এদিকে অন্য একটি সূত্র জানায় প্রায় দেড় মাস ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে ৭ এপ্রিল তিনি শেষ নিশ্বঃস ত্যাগ করে। (সূত্র : ৮ এপ্রিল, দৈনিক আজাদ)। ফলে তার মৃত্যুর তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। তাঁর লাশ বাড়ীতে আনার চেষ্টা করা হলেও অবরোধ আর হরতালের কারণে সম্ভব হয়নি। ঢাকাস্থ আজিমপুর গোরস্থানে নামাজে জানাযা শেষে অজু খানার উত্তর পাশে ৫/৬টা কবরের পর সালামের দাফন সম্পন্ন হয় বলে নামাজে জানাযায় অংশগ্রহণকারী মকবুল আহমদ গত ১৮ ফেব্রুয়ারী তার সাথে সাক্ষাতে জানান এবং শহীদ সালামের জেঠাতো ভাই হাবিব উল্যাহও একই কথা ১৯৯৮ সালে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
শহীদ সালামের চাকুরী স্থলে তার ছোট ভাই আবদুস সোবহান স্থলাভিষিক্ত হন। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি শিল্প দপ্তরে রূপান্তরিত হয়। সালামের রক্ত মাখা শার্ট সহ আরো কিছু স্মৃতি সাবলিত ট্রাংকটি স্বাধীনতার কয়েক বছর পর সিধেঁল চোর নিয়ে যায়। সালামের শেষ স্মৃতি দু খানা ছবি ছিল তা ফেনীর আওয়ামী লীগ নেতা খাজা আহমদকে প্রয়োজনে দেয়া হলেও ওনার মৃতু্যর পর সে ছবি খোঁজ করে পাওয়া যায়নি। তবে ২০০৪ সালে শহীদ সালামের পরিবারের দেয়া তথ্য ও ধারণায় রাশা ভাস্করের শিল্পী তুলিতে কল্পনায় সালামের একটি ছবি একঁছেন।
এদিকে ফেনীর সাংবাদিকদের ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সরকার সালাম পরিবার ও এলাকাবাসীর কিছু দাবী বাস্তবায়ন হয়েছে। বাস্তবায়িত দাবীগুলো হলো : ১৯৯৯ সালের ১৮ নভেম্বর ফেনী জেলা পরিষদের অর্থায়নে ফেনী শহরের মিজান রোডে অবস্থিত কমিউনিটি সেন্টার ভাষা শহীদ সালামের নামে নামকরণ করা হয়।
২০০০ সালে ফেনী জেলার একমাত্র স্টেডিয়াম ভাষা শহীদ সালামের নামে নামকরণের ঠিক দু' বছরের মধ্যেই জেলা ক্রীড়া সংস্থা স্টেডিয়ামের দেয়াল থেকে সালামের নাম মুছে ফেলেছিল। ফেনী বাসীর দাবী ও ক্ষোভের মুখে পড়ে তৎকালীন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবদীনের একান্ত প্রচেষ্টায় আবার ভাষা শহীদ সালাম স্টেডিয়াম নামকরণ করা হয়।
শহীদ সালামের জন্মস্থান লক্ষ্মনপুর গ্রামের নাম পরিবর্তন করে সরকারী ভাবে সালাম নগর হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২০০৭ সালে ২১ ফেব্রুয়ারী দাগনভুঞা উপজেলা মিলনায়তনের 'ভাষা শহীদ সালাম মিলনায়তন' নামে নামকরণ করা হয়। ঐদিন জেলা প্রশাসক মোঃ মাছুম খান ফলক উম্মোচন করে তা উদ্বোধন করেন। ২০০০ সালে সরকার শহীদ আবদুস সালামকে মরনোত্তর 'একুশে পদক' প্রদান করেন। এছাড়া ভাষা শহীদ আবদুস সালামের স্মৃতি রক্ষায় সালাম নগর গ্রামে ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ২৫৮ টাকা ব্যয়ে একটি স্মৃতি গ্রন্থাগার ও জাদুঘর নির্মান কাজ চলছে। এডিপির অর্থায়নে এলজিইডির অধীনে জেলা পরিষদ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। অপর দিকে ২০০০ সালে তৎকালীন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদীন হাজারীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সালাম নগরে কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পাশে একটি শহীদ মিনার নির্মান করে। সে থেকে ঐস্থানে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারীতে শহীদ সালাম স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগ নানা কর্মসূচীর আয়োজন করে।
যেসব দাবী পূরণের অপেক্ষায় : ভাষা শহীদ আবদুস সালামের কবর সনাক্ত ও সংরক্ষণ করণ, দাগনভূঞা জিরো পয়েন্টকে সালাম চত্ত্বর নামকরণ করা, সালাম নগরে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সালামের নামে নামকরণ করে সরকারী করণ, ভাষা শহীদ সালামের বাড়ী যাওয়ার রাস্তাটি পাকা করণ সহ আরো কয়েকটি দাবী রয়েছে বর্তমান সরকার বায়ান্নর ভাষা শহীদ জাতির গর্বিত সন্তান আবদুস সালামের কবর সনাক্ত ও সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া জন্য এলাকাবাসী বিশেষ ভাবে দাবী জানান।
Share/Save/Bookmark